আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ– কল্পনায় ও সম্পাদনে আন্তর্জাতিক

Posted by Kaahon Desk On March 25, 2018

অল্টার্নেটিভ লিভিং থিয়েটারের প্রযোজনা আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ নিঃসন্দেহে এই সময়ের বাংলা নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস যা যুগপৎ ‘নাটক’ শব্দটিকে নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে এবং সমসাময়িক আন্তর্জাতিক নাট্যচর্চার সাথে এখানকার নাট্যপ্রয়াসকে সম্পৃক্ত করে।এটি কেন উচ্ছ্বসিত অতিকথন নয়, তা যুক্তি দিয়ে প্রতিপন্ন করার জন্য আমি প্রযোজনাটিকে যে পাঠ-প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে যাব তার সামান্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে দুটি ভিন্ন স্থানে (মধ্যমগ্রামের একটি বাড়ির বাগানে এবং টালা পার্কে) দুইবার এই নাট্যটি – যা পারফর্মেন্স বলে চিহ্নিত হলেই বেশি ভালো হয় – দেখার পর আমার মনে হয় এটিকে পাঠ করা যেতে পারে Performance Studies’এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড শেকনারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের আলোকে। প্রবন্ধটির নাম “Six Axioms for Environmental Theatre”। শেকনার শুধু থিয়েটার/পারফর্মেন্সের শিক্ষক বা তাত্ত্বিক নন, তিনি The Performance Group নামক একটি নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতাও, যে দল ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮০ সাল অব্দি নানান পরীক্ষানিরীক্ষামূলক কাজের মাধ্যমে (যার মধ্যে অনেকগুলি শেকনারিয় Environmental Theatre) নাট্য তথা পারফর্মেন্সের দিগন্তরেখাটাকেই অনেকটা প্রসারিত করেছে; ১৯৮০ সালের পর থেকে সেই দল থেকেই উৎপন্ন The Wooster Group এখনো সারা পৃথিবীতে থিয়েটারের নতুন সম্ভাবনার অনুসন্ধান করে চলেছে।আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ  পুরোদস্তুর Environmental Theatre কি না, বা যারা এই নাট্য নির্মাণ করেছেন তারা এটিকে Environmental Theatre হিসেবেই তৈরী করতে চেয়েছেন কি না, তা নিয়ে কোন নিদান দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। আমার বিশ্বাস শেকনারের প্রবন্ধের নিরিখে এই নাট্যটি পাঠ করলে যে এটিকে বুঝতে সুবিধে হবে শুধু তাই নয়, এই কাজটিকে যথাযথ মর্যাদাও দেওয়া যাবে। অবশ্যই বলে রাখা উচিত, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ ’এর অন্য পাঠ’ও সম্ভব (যেমন রবীন্দ্রনাথের বা বাদল সরকারের বা গ্রোটোওস্কির নাট্যভাবনার নিরিখে – যদিও শেষোক্ত গ্রোটোস্কির নাট্যচিন্তা শেকনার তার তত্ত্বে অন্তর্গত করে নিয়েছেন) এবং চাইব অন্য কোন লেখায় সে সম্ভাবনা সাকার হবে। যদিও আমি এই আলোচনায় শেকনারের প্রবন্ধের ছয়টি axiom’এর সাহায্যেই আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ বোঝার চেষ্টা করতে করতে এই পারফর্মেন্সের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির খতিয়ান দেওয়ায় প্রচেষ্ট হব, তবে তা প্রবন্ধের ক্রমে করব না এবং কিছু ক্ষেত্রে একাধিক axiom’কে একত্রে নিয়ে আসব।

Previous Kaahon Theatre Review:

শেকনারের দুই ও তিননম্বর axiom যথাক্রমে এরকম –“ALL the space is used for the performance; all the space is used for audience” এবং “THE theatrical event can take place either in a totally transformed space or in ‘found space’ “। বোঝাই যাচ্ছে, শেকনার পারফর্মেন্স স্পেস নিয়ে খুব গভীরভাবে ভাবিত; দু’টি axiom তিনি স্পেস নিয়ে আলোচনার জন্য বরাদ্দ করেছেন এবং অন্য axiom’এও স্পেস এসে পড়ে। আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ’এর প্রেক্ষিতে শেকনারের স্পেস-ভাবনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক কারণ শেকনার থিয়েটার তথা পারফর্মেন্সকে যে স্পেসে নিয়ে যেতে চেয়েছেন Environmental Theatre চর্চার মধ্যে দিয়ে, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ সেই ধরণের স্পেসে উপস্থাপিত হয়। এই স্পেস কেমন? প্রথমত, কখনোই এই স্পেস প্রসেনিয়াম নয়, এই স্পেস হয় (আমূল) বদলে নেওয়া কোন জায়গা (transformed) নয় যেমনভাবে পাওয়া তেমনভাবে ব্যবহার করা একটি জায়গা (found)। আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ যে স্পেস ব্যবহার করে তা দ্বিতীয় ধরণের – মধ্যমগ্রামের বাগান বা টালার উদ্যান যেভাবে পাওয়া গেছে সেভাবেই ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখ্য, এই নাট্য অন্য কোন জায়গাতেও হতে পারে, শুধু সেখানে গাছপালা সম্বলিত পরিবেশ আবশ্যিক – অন্যভাবে বললে এটি পরিবেশ নির্ভর কাজ, সাইট স্পেসিফিক নয়।আড়ালের বা উচ্চতার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে পরিবেশে থাকা গাছ, মাটিতে গেঁথে দেওয়া হয়েছে শলাকা, ধুলোবালি ঢেকেছে পারফর্মারের সর্বাঙ্গ – পরিবেশের এই প্রত্যাশিত ব্যবহারের পাশাপাশি এমন কিছু জিনিস তৈরী হয়েছে খোলা ফাউন্ড স্পেসে কাজটি করার জন্য যা আলাদাভাবে মন্তব্য দাবী করে।

শেকনার লিখছেন, “…one negotiateswith an environment, engaging in a scenic dialogue with a space”। দুটি আলাদা ঠিকানাতেই আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ’কে দুটি আলাদা স্পেসের সাথে বোঝাপড়া করতে হয়েছে, ঢুকতে হয়েছে নাটকীয় সংলাপে। মধ্যমগ্রামে নাট্যটির শাব্দিক পরিবেশে (sonic environment) ঢুকে ছিল মাইক বাহিত কীর্তনের ধ্বনি, এক দুইবার এরোপ্লেনের আওয়াজ, একসময় পাশের বাড়ির টিভির উচ্চকিত শব্দ ও তা কমানোর অনুরোধ যাওয়ায় বিরক্ত পুরুষ কণ্ঠের আপত্তিসূচক নালিশ। টালা পার্কে এক সময় একপাল কুকুরের চিৎকার এসে পড়ে নাট্যের অন্দরে, পাঁচিলের ওপারের গাড়ির হেডলাইটের আলো দৃশ্যকাব্যের অন্তর্গত হয় একাধিকবার। এই ধরণের থিয়েটারের মজা বা বৈশিষ্ট্য এটাই যে সবসময় সবকিছু পারফর্মারদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না – কিছু জিনিস পারফর্মেন্স টেক্সটের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ হবে, কিছু হবে না। একদিকে আগে থেকে প্রস্তুত অন্যদিকে হঠাৎ করে চলে আসা উপাদানের সংঘাত/সমন্বয় নিয়েই পারফর্মারদের ও দর্শকদের অর্থ তৈরী করার প্রক্রিয়াটা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে – “the given elements of any space-its architecture, texturalqualities, acoustics, and so on-are to be explored, not disguised”, বলছেন শেকনার। রাজাকে খুন করার পর ম্যাকবেথ ‘আমেন’ শব্দটি উচ্চারণ করতে পারেন না কারণ তার জগত হয়ে গেছে ঈশ্বর বিবর্জিত; এই অবস্থায় নামসংকীর্তনের ধ্বনি একধরণেরirony সৃষ্টি করে যা পরিকল্পিত নয়। আবার গাড়ির হেডলাইটের আলো যখন নাট্যে ঢুকে এমন কিছু আলো-ছায়ার খেলা তৈরী করে যা কারো নিয়ন্ত্রণে নয়, তখন তা যেন মানুষের সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণে রাখার তাড়নকেই বিদ্রূপ করে (যথা – খুনের পর খুন করে ম্যাকবেথ ও রানীর নিজেদের নিয়তির রাশ নিজেদের হাতে রাখা, পারফর্মারদের মহলা করে নাট্যের রাশ নিজেদের হাতে রাখা, সাধারণ ভাবে পরিকল্পনার জাল বুনে আমাদের জীবনভাগ্যের রাশ হাতে রাখা)।

তবে শুধু স্থানিক (spatial) পরিবেশ নয়, এই কাজটির জন্য যে সাময়িক (temporal) পরিবেশটি বেছে নেওয়া হয়েছে – সন্ধ্যা নামার পর থেকে দেড় ঘন্টা– সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ (শেকনার অবশ্য তার লেখায় পরিবেশের সময়গত দিক নিয়ে কিছু বলেননি)। পড়ন্ত বিকেলের মরে আসা আলোয় শুরু হওয়া নাট্য যখন শেষ হয় তখন আকাশ পুরো অন্ধকার – এটা যেন একদিকে ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথের অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়াটাকে ধরে আর অন্যদিকে ইঙ্গিত করে চরিত্রদের গহন অবচেতনে ডুব দিতে দিতে পারফর্মারদের নিজেদের মনের অন্ধকারে প্রবেশ করা।

তার দেওয়া প্রথম axiom’এ – “THE theatrical event is a set of related transactions” –শেকনার বলছেন বিভিন্ন ধরণের দেওয়া নেওয়া, আদান প্রদানের কথা যার মধ্যে দিয়ে একটি নাট্য-ঘটনা গড়ে ওঠে, যার মধ্যে আছে পারফর্মারদের নিজেদের মধ্যে, দর্শকদের নিজেদের মধ্যে, পারফর্মারদের এবং দর্শকদের মধ্যে বহুমাত্রিক বিনিময়।আদানপ্রদান বলতে কেবলমাত্র পারফর্মেন্স চলাকালীন পারফর্মারদের মধ্যে যে বিনিময় সৃষ্টি হয় বাধ্যতামূলকভাবে তার কথা বলা হচ্ছে না, পারফর্মেন্স তৈরীর সময়ে থেকেই পারফর্মারদের মধ্যে একটা দেওয়া নেওয়ার, একটা বোঝাপড়ার কথা বলতে চাইছি, যা না থাকলে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ  সম্ভব নয়। এই নাট্যটি তৈরী হয়েছে বহু সময় ধরে, বেশ কিছু ওয়ার্কশপের মধ্যে দিয়ে এবং সে সময়ে অবশ্যই গড়ে উঠেছে পারফর্মারদের নিজেদের মধ্যে একধরণের বিশ্বাসের সম্পর্ক যার ফলে (উদাহরণ স্বরুপ) লেডি ম্যাকবেথের খন্ডিত দুই সত্তার গভীর চুম্বনের দৃশ্য বা ম্যাকবেথ ও লেডি ম্যাকবেথের শরীর থেকে রক্তচিহ্ন মুছে ফেলার জন্য স্নান করতে করতে যৌন মিলনে লিপ্ত হওয়ার মত দৃশ্য সাবলীলভাবেই উপস্থিত হয়। শুধু এই তথকথিত ‘সাহসী’ দৃশ্যেই যে পারফর্মারদের আদানপ্রদানের ইতিহাস চোখে পড়ে তা নয়, গোটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ  জুড়েই থাকে পারফর্মারদের নিজেদের মধ্যে আদানপ্রদানের সুস্পষ্ট চিহ্ন, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ কোরাসের আগাগোড়া ছন্দবদ্ধ থাকায়। দর্শকদের নিজেদের মধ্যে আদানপ্রদানের বিষয়ে শেকনার নিজেও খুব নিশ্চিত ছিলেন না এবং এই ব্যাপারটা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। তবে যে ব্যাপারটা নিয়ে শেকনার তার বেশ ক’টি axiom’এ বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে আলোচনা করেছেন তা হচ্ছে পারফর্মারদের এবং দর্শকদের মধ্যে বহুমাত্রিক আদাপ্রদানের বিষয়টি। এ বিষয়ে প্রবন্ধের বিভিন্ন অংশে শেকনার যা বলছেন তার নির্যাস হল Environmental Theatre দাবী করে পারফর্মেন্সে দর্শকদের এমন এক সক্রিয় যোগদান যার দ্বারা (১) দর্শক’ও পারফর্মেন্সের অন্তর্গত থাকবেন এবং (২) দর্শক’ও একভাবে পারফর্ম করবেন। কিন্তু বলতেই হচ্ছে যে পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ  দর্শক ও পারফর্মারদের মধ্যে একটি সচল, আদানপ্রদানমূলক সম্পর্কস্থাপন করার ব্যাপারে প্রচেষ্ট হয়নি। এটা ঘটেছে মূলত যে কারণে তা হল মঞ্চ থেকে বেরিয়ে আসার পর’ও আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথে  থেকে গেছে কিছু গতানুগতিক ব্যবস্থা – দর্শক এক জায়গায় বসে সামনে হওয়া পারফর্মেন্স দেখেছেন, যেমনটা সাধারণভাবে হয়ে থাকে। দর্শকাসন ও পারফর্মেন্স স্থান ছিল স্পষ্টভাবে বিভাজিত, যার ফলে গোটা ব্যাপারটায় “…a sense of shared experience” হওয়া যতটা সম্ভব ছিল তা হয়ে ওঠে নি। আমরা যে নাট্যে অভ্যস্ত সেখানে দর্শক থাকেন এক জায়গায় স্থির, যদিও শেকনারের ভাবনায় দর্শক’ও সচল এবং তার কারণ যতটা না নান্দনিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। যেমনভাবে কোন রাজনৈতিক প্রদর্শনে বা মিছিলে যারা পাশে দাঁড়িয়ে থকেন কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অন্তর্ভুক্তি হয়ে যায় সেই প্রদর্শনে বা মিছিলে (যা শেকনার পারফর্মেন্স হিসেবেই গণ্য করেন), তেমনভাবে Environmental Theatre চায় পারফর্মেন্সের মধ্যে দর্শকের অন্তর্ভুক্তি যার ফলে “…the entire space (becomes) a performingspace; no one is just watching.”। আশা করব এই বিষয়টি নিয়ে পারফর্মেন্স নির্মাতারা ভাববেন। দর্শক কোথায় বসবেন, তারা কি দেখবেন বা দেখবেন না এসব নিয়ে শেকনার যে যথেষ্ট ভেবেছেন তার প্রমাণ তিনি একটি বেশ র‍্যাডিকাল axiom দিয়েছেন (চতুর্থ) –“FOCUS is flexible and variable” – যেখানে উনি বলছেন যে নাট্যের সব কিছু যে সবাই দেখবেন বা তাদের সবাইকে সবকিছু দেখাতেই হবে, এমনটা নয়। আসলে শেকনার চাইছেন Environmental Theatreবর্জন করুক মঞ্চের well-made theatre’এর ধরণএবং নৈকট্য স্থাপন করুক জীবন-নাট্যের সাথে, যে নাট্যের একটা খণ্ডেরও সমস্তটা আমাদের অধরা থাকে। আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথে এটা কিছুটা হয়েছে আলো-অন্ধকারের, আড়ালের (গাছের ডাল, পাতা, পর্দার) জন্য – তবে শেকনার বর্ণিত মাল্টি-ফোকাস এবং লোকাল-ফোকাস নিয়ে খেলার সুযোগ যে এখানে আরো আছে তা অনস্বীকার্য।

ট্রান্সাকশনের কথা বলতে গিয়ে শেকনার আরো কিছু আদানপ্রদানের ওপর জোর দিয়েছেন যা ঘটে “Among production elements; Between production elements and performers; Between production elements and audience”। উপরন্তু উনি তার পঞ্চম axiom’এ ফিরে এসেছেন production elements’এ – “ALL production elements speak their own language” – যেখানে উনি পারফর্মারদের অনান্য উপাদানের (“…scenery, costume, lighting, sound,make-up…” এবং অডিও-ভিস্যুয়াল প্রযুক্তি) তুলনায় বাড়তি গুরুত্ব দিতে নারাজ। আমি সংক্ষেপ করার জন্য শুধু এটুকুই বলব – আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ এমন একটি পারফর্মেন্স যেখানে সবকটি উপাদান (অডিও-ভিস্যুয়াল প্রযুক্তি এখানে ব্যবহার করা হয় নি) শেকনার-উল্লিখিত আদানপ্রদানে শুধু থেমে থাকে নি, সবকটি উপাদান তাদের নিজস্ব ভাষায় কথাও বলেছে। শেকনার একাধিকবার বলেছেন “…technicians should be a creative part of the performance”; আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথে এটি ঘটেছে, যা সচরাচর আমাদের স্থানীয় নাট্যচর্চায় ঘটে না।

ষষ্ঠ এবং অন্তিম axiom’এ শেকনার বলছেন “THE text need be neither the starting point nor the goal of a production. There may be no verbal text at all”। না, এমনটা নয় যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ টেক্সটশূণ্য। তবে বেশ অবাক লাগে যখন দেখি শেকনার তার প্রবন্ধে দু’জন প্রখ্যাত মানুষের (গ্রোটোওস্কি এবং জন কেজ) কথা উদ্ধৃত করে টেক্সট সম্বন্ধে যা বলছেন, তার প্রায় পুরোটাই ফলে যাচ্ছে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথের ক্ষেত্রে –গ্রোটোওস্কি বলছেন টেক্সটকে এমনভাবে বদলে ফেলার কথা যা তৈরী করবে একধরনের মন্তাজ যেখানে সম্ভব হবে পারফর্মারদের টেক্সটের সম্মুখীন হওয়া (to confront) এবং কেজ বলছেন টেক্সটকে পরিবর্তনীয় রসদ (material) হিসেবে দেখার কথা। এখানে টেক্সট পাঁচজন লেখকের ম্যাকবেথ  নামক ক্লাসিকের পাঠ, যা ম্যাকবেথ ও তার রানীর জীবনের কোন সরলরৈখিক আখ্যান পেশ না করে বিবর্ধিতভাবে সামনে আনে ম্যাকবেথ নাটকের বিষয়গত মূলে থাকা উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লোভ, লালসা, পুরুষকার, নপুংসকতা ইত্যাদি ধারনাসমূহ। এর ফলে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথে (শেকনারের মত করে বললে) ম্যাকবেথ করা হয় না, ম্যাকবেথ নিয়ে করা হয়। এই করায় যা উঠে আসে, এবং যা আমাদের স্মৃতিতে গেঁথে যায় তা হল প্রযোজনার অন্য যে কোন উপাদানের মত একটি উপাদান হয়ে টেক্সটের থেকে যাওয়া বা অন্যভাবে বললে, সামগ্রিকভাবে পারফর্মেন্সের টেক্সটকে ছাপিয়ে যাওয়া। এই ব্যাপারটা বিশেষভাবে প্রতিভাত হয় ম্যাকবেথ নাটকের কিছু অবিস্মরণীয় দৃশ্যের অনবদ্য উপস্থাপনে – যেমন ড্যাগার সিন বা বিরনাম জঙ্গলের ম্যাকবেথকে ঘিরে ফেলা –যেখানে কথা নয়, করাটাই মূখ্য। স্থানাভাবে এই দৃশ্যগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করা যাচ্ছে না, যদিও সেগুলো আলোচনা দাবী করে। একটি দৃশ্য নিয়েই শুধু বলি। হিংস্রতাসম্বলিত আদিম অরণ্য ম্যাকবেথের নিজের সৃষ্টি, ম্যাকবেথের মনের মধ্যেই রয়েছে অশুভ অন্ধকারের জঙ্গল – এই বিষয়টি যেভাবে পারফর্ম করা হল সাদা কাপড়ে সবুজ, কালো আর লাল রঙের জোরালো পোঁচের ওপর পোঁচ মেরে এবং তারপর সেই কাপড় গোটা শরীরে জড়িয়ে নিয়ে (তালবাদ্যে তখন তৈরী হয়েছে অশুভের দমবন্ধ আবহ আর আলো করে তুলেছে অন্ধকারকে দৃশ্যমান), তার কল্পনায় যেমন আন্তর্জাতিক মননের ছাপ স্পষ্ট, সম্পাদনের গুণে তেমন তার মান’ও আন্তর্জাতিক।

এই প্রযোজনার সাথে যারা যুক্ত তাদের কারো নাম আলাদা করে না দিয়ে অল্টার্নেটিভ লিভিং থিয়েটার-কেই অকুন্ঠ সাধুবাদ দেবো আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ  উপহার দেওয়ার জন্য; এই পারফর্মেন্স বাংলার নাট্যচর্চা সম্পর্কে ভরসা রাখতে উৎসাহ যোগায়। শেষ করব এটা বলে যে যারা এই পারফর্মেন্সটি না দেখে এই লেখাটি পড়লেন, তারা দয়া করে ভাববেন না আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাকবেথ একটি শুষ্ক বৌদ্ধিক চর্চা মাত্র – এটি একটি অত্যন্ত জীবন্ত, উদ্দীপক পারফর্মেন্স যা স্পর্শ করেছে Environmental Theatre’এর হৃদয় এবং আপনার দেখার পরে যা ছুঁয়ে যাবে আপনাকেও।

Dipankar Sen
A student of theatre as an art practice, he is definitely a slow (but hopefully, steady) learner. He is a father, a husband and a teacher of English literature in the West Bengal Education Service. His other interests include literature in translation and detective fiction.

Read this review in English.

ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।

Related Updates

Comments

Follow Us

Show Calendar

  • 21

    Jul2018

    Paona Ganda | Bengali Play... more

  • 21

    Jul2018

    Udvat Puran | Bengali Play... more

  • 21

    Jul2018

    Taan | Bengali Play | 6:30pm | Madhusudan Mancha | Bivaba Natya Academy... more

  • 21

    Jul2018

    Na Natabor | Bengali Play | 6:30pm | Girish Mancha | Ballygunge Rainbow... more

  • 21

    Jul2018

    Sunil Sagare Ekti Jonaki | Bengali Play | 7:30pm | Madhusudan Mancha | Bivaba Natya Academy... more

  • 21

    Jul2018

    Kojagori | Bengali Play | 7:30pm | Muktangan Rangalaya | Dilip Mukherjee Smriti Sangha... more

  • 22

    Jul2018

    Shekal Chenra Hater Khonje | Bengali Play... more

  • 01

    Aug2018

    Obhishto | Bengali Play... more

  • 01

    Aug2018

    Talbetal | Bengali Play | 6:00pm | Gyan Mancha | Goppowala... more

  • 01

    Aug2018

    Magon Rajar Pala | Bengali Play... more

  • 01

    Aug2018

    Pratibimba | Bengali Play... more

  • 01

    Aug2018

    Moteram Ka Satyagraha | Bengali Play... more

  • 01

    Aug2018

    The Open Closet | Bengali Play... more

  • 01

    Aug2018

    Good Morning Nishikanto | Bengali Play | 8:00pm | Gyan Mancha | Rupakaar... more

Message Us