মিনার্ভা রেপার্টারির ‘য্যায়সা কা ত্যায়সা’- মঞ্চ থেকে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্রব্ধ উষ্ণতা

Posted by Kaahon Desk On March 1, 2018

একটু যদি ভেবে দেখি তাহলে দেখা যাবে আমাদের জীবনে দেখা অসংখ্য নাটকের মধ্যে সামান্য কিছু নাটকের বিশেষ কিছু মূহুর্তই চিরস্থায়ী হয়ে রয়ে গিয়েছে। বাকিটা খুব স্বাভাবিকভাবেই হারিয়ে গেছে, যেমন হারিয়ে যায় প্রতিনিয়ত দেখা, শোনা, পড়া অনেক কিছুই। সাম্প্রতিককালে দেখা বহু নাটকের ক্ষেত্রে দেখেছি তারা ওই বিশেষ কিছু নাট্যমুহুর্ত তৈরি করা ছাড়া কোনো সম্পূর্ণতা দিতে পারেনি। বিশেষ বিশেষ নাট্যমুহুর্তগুলো ফেলনা তা বলছি না- অনুভব, ভালোলাগা, ভালোবাসা তো মুহুর্তকামী-ই! কিন্তু সম্পূর্ণ উপস্থাপনা শেষে যদি নাট্যরস সঞ্চারিত হতে না পারে, যদি আরেকবার কাজটা দেখতে ইচ্ছে না করে – তাহলে রসিকমনের কিসের পরিতৃপ্তি? তখন কেবল খুঁতখুঁতানিই সম্বল। অনেকদিন পর এমন সমস্ত ভাবনাকে ছাপিয়ে মাতিয়ে দিলো সুমন্ত রায়ের পরিচালনায় মিনার্ভা রেপার্টারির ‘য্যায়সা কা ত্যায়সা’। কোনো মিউজিক কনসার্টের প্রত্যেকটা ভায়োলিন প্রত্যেকটা বাঁশি যখন নিজ নিজ সুরে বেজে ওঠে – তৈরি হয় ঐকতান- দর্শকমনে খুব সহজেই পৌঁছে যায় সেই অনুরণন। একইভাবে নাটকের আলো, সেট, মিউজিক, সকল অভিনেতার পারস্পরিক অভিনয় একই ছন্দে চলতে থাকলে দর্শকমনেও সঞ্চারিত হয় সেই ছন্দের; গড়ে ওঠে মঞ্চ আর কালো মাথাগুলোর মিলনের ওম।

Previous Kaahon Theatre Review:

সপ্তদশ শতকে ফরাসী নাট্যকার মলিয়ারের কমেডি নাটক ‘L’ Amour Medecin’ থেকে উনিশ শতকের বাংলায় গিরিশ ঘোষ লিখে ফেলেন ‘য্যায়সা কা ত্যায়সা’। বয়ঃসন্ধির যুবতী কন্যা রতনমালা তার প্রেমিকের সাথে যেনতেন প্রকারেণ মিলনে উৎসুক। কিন্তু তার ম্যানিয়াগ্রস্ত বড়লোক বাবা হারাধন কিছুতেই মেয়ের বিয়ে দেবেন না।সম্বন্ধ করতে এলেই বাড়ির দোরগোড়া থেকে সম্বন্ধকারীদের ভাগিয়ে দেন তিনি। এমতাবস্থায় রতনের মনের ব্যামো সারাতে উদগ্রীব সখীর দল ছলচাতুরী করে তাকে তার প্রেমিক রসিকমোহনের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। বিবাহ,সামাজিকতা, যৌনতার প্রকাশের ওপর উপস্থাপিত এই প্রহসনটি উনিশ শতকের কলকাতার সমাজচেতনা থেকে এগিয়ে থাকা একটি প্রয়াস বলাই যায়। তাই আজও একবিংশের কলকাতায় দাঁড়িয়ে এই প্রহসন প্রাসঙ্গিক, উপভোগ্য এবং চিন্তনের রসদ।

কমেডির ক্লাসিকাল সংজ্ঞার একটি অংশ নিয়ে ভাবলে উঠে আসে বিদ্রূপের কথা। সমাজের এক বিশেষ দিকে ওঠে বিদ্রুপের আঙুল। বাবা তার মেয়েকে টাকা-পয়সা, ধনরত্ন, ফুলের বাগান, দামী পোষাক, দাসী দিয়ে ভরিয়ে রেখেছেন, পড়াশোনা শিখিয়েছেন, গানবাজনা শিখিয়েছেন, বুনতে শিখিয়েছেন- যখন যা চেয়েছে তাই এনে দিয়েছেন। সমস্ত বস্তুগত চাহিদা ছাপিয়েও মানুষের যে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়, ইচ্ছে হয় যৌনচাহিদা প্রকাশ করতে তা মানতে নারাজ রতনের বাবা হারাধন। তাই মেয়ের মন খারাপের কারণ বুঝেও বুঝতে চায়না সে। মেয়ের ইচ্ছা গুরুত্বহীন, বরং নিজের মতো ভেবে নিয়ে মেয়েকে কোন মতেই বিয়ে দেবেন না তার বাবা। মেয়েদের যৌনতার প্রকাশকে যেভাবে যুগ যুগ ধরে চেপে রাখা হয়েছে তার ব্যতিক্রম এই নাটক। গিরিশ ঘোষের এই নাটকজুড়ে রতনমালার প্রেমের আবেদনে, নাচেগানে সখীদের শরীরী বিভঙ্গে মেয়েদের উপস্থিতি, যৌনচেতনার আত্মপ্রকাশ হয়েছে সাবলীল। বিয়ের সম্বন্ধ আসতে থাকে…আসতে থাকে জহুরী, পোষাক বিক্রেতা, এসেন্স বিক্রেতা তাদের নিত্যনতুন ‘স্বদেশী’ প্রোডাক্ট বিক্রির ধান্দায়। জানা যায় তাদের ‘স্বদেশী’ নাম দিয়ে বিক্রি করা সমস্ত প্রোডাক্ট’ই আসলে ফরাসী, জার্মানি বা হ্যামিলটনের। তৎকালীন কলকাতায় স্বদেশী আন্দোলনের ভাঙনের দিকটা নির্মল হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে খুব স্পষ্ট ভাবে দেখানো হয়। কমেডির উপাদানগুলি অত্যন্ত রাজনৈতিক। অসুখই হয়নি যখন, তারপরেও প্রত্যেকজন বদ্যির আলাদা আলাদা রোগ ঠাউরানো বা আলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথির চিরকালীন দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা স্যাটায়রিকাল মুহুর্ত অনেকদিন মনে থাকবে।

টেক্সট বা স্ক্রিপ্ট যেমনই থাকুক না কেন, কোনো পারফরমেটিভ আর্টের পারফর্মেন্সের দিকটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। অভিনয়ের টোন প্রথম থেকেই চড়া আর সেই তীক্ষ্ণ টোন পুরো পারফর্মেন্স জুড়ে বজায় রাখার সমতায় তা এক অপূর্ব মাত্রা পেয়েছে। স্ক্রিপ্টের স্বার্থে এবং সামগ্রিক হাস্যরসের পরিমন্ডল গঠনের স্বার্থে অভিনেতাদের নাটকীয়তা এবং অতি-নাটকীয়তা বেশ সচেতনভাবেই রাখা হয়েছে। প্রত্যেক অভিনেতার সেই অতি-অভিনয়ের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং প্রথম থেকে শেষ অবধি তা বজায় রাখায় নাটক ছুঁয়ে যেতে থাকে মঞ্চের এপারের সমস্ত দর্শককে। শুধুমাত্র নিজেদের স্ব স্ব অভিনয়ের জায়গাটুকুই নয়, পারস্পরিক অভিনয়ের আদানপ্রদান ও স্পেস শেয়ারিং’এও প্রত্যেক শিল্পী আলাদা করে প্রশংসার দাবী রাখেন। জমিদার হারাধনের চরিত্রটি বেশ লাউড হলেও দাসদাসীদের একত্রিত চড়া অভিনয়ের পরিমণ্ডলে নিজেকে সংযত করে নেন অভিনেতা –সমতা বজায় থাকে, মঞ্চ থেকে পৌঁছোতে থাকে উত্তাপ।

গিরিশ ঘোষের মূল নাটকে কিছু চরিত্র না থাকলেও নির্দেশক সুমন্ত রায় তাদেরকে নিয়ে এসেছেন এই উপস্থাপনায়। পরিচালকের এই নবপাঠও তার প্রয়োগ আমাদের অসাধারণ কিছু নাট্যমুহুর্তে উপহার দেয়। গিরিশ ঘোষের রচনায় রতনমালার মৃত মায়ের কথা সবার মুখে মুখে ঘুরলেও তার মঞ্চে অবতীর্ণ হওয়ার জায়গা ছিল না কোনো। আপস্টেজে মালাশোভিত কাঠের ফ্রেমে ভেসে থাকে রতনের মায়ের মুখ আর নাটকের চলনের সাথে সাথে সেই মুখে বিভিন্ন অভিব্যক্তি ফুটে উঠতে থাকে। মারা গেলেও এই সংসারের প্রতিটা ঘটনায়, মেয়ের প্রতিটা আচরণে কাতরতা প্রকাশ পেতে থাকে তার টুকরো সংলাপে এবং অভিব্যক্তিতে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন রতনের একজনমাত্র সখী গরবের পরিবর্তে গরব সহ মোট তিনজনকে ব্যবহার করা। তাদের হাসি, ঠাট্টা, চতুরতা, নাচগানে উজ্জ্বল আত্মপ্রকাশে মেতে ওঠে মঞ্চ। সখী পরিবৃতা রতনমালা প্রেমিকের সাথে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় উতলা আর সখীরা বন্দোবস্ত করছে মিলনের–দৃশ্যপট মিলেমিশে যায় প্রাচীনকাল থেকে শুনে আসা রাধাকৃষ্ণের প্রেমগাথায়।

সেই সময়ের কলকাতাকে বোঝানোর জন্য বিশাল কিছু আয়োজন লাগেনা। স্টেজের একপাশে থাকা রাস্তার ল্যাম্পপোস্টই বুঝিয়ে দেয় সময়কাল। ভেপার ল্যাম্পের আলোয় প্রেমিক প্রেমিকার প্রথম মিলনের দৃশ্য হয়ে ওঠে মায়াবী। পুরোনো কলকাতার আমেজ পাওয়া যায় জমিদারী ঠাটে বাটে, পোষাক নির্বাচনের নিপুণতায়, বিক্রেতাদের পর্বে বিদেশী বস্তু স্বদ্বেশী জিনিস বলে চালানোর কৌশলে। আলোর ব্যবহারে পলাশ দাস ও সুমন্ত রায়ের কাজ তথালাইভ মিউজিকে দেবরাজ ভট্টাচার্যের কাজ অনেকদিন মনে থাকবে। আলো ও সঙ্গীতের অসামান্য মেলবন্ধনে একমুহুর্তে ঘরের ব্যক্তিগত আমেজ বদলে যায় বিয়ের কলধ্বনীতে। বিভিন্ন সময়ে এই নাট্য-আবহাওয়ার পরিবর্তনে লাইভ মিউজিকের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

দুঃখের বিষয় এমন একটি প্রযোজনা দেখতে দর্শকরা দল বেঁধে আসছেন না। তবে তা উপেক্ষা করে এই প্রযোজনা চালু থাকা উচিত আরো অনেকদিন। রেপার্টারির কর্মশালা ভিত্তিক নাটকের পেশাদারিত্বের দিকটা ফুটে ওঠে প্রত্যেকের পারফর্মেন্সে। এমন কর্মশালা চালু থাক, এমন নাটক আরো হতে থাকুক যার অনুভব শুধু মুহুর্তকামী নয় বরং সঞ্চয় করে রাখা যেতে পারে দীর্ঘসময়।

Labanya Dey
I am an ardent learner in the field of literature, performing arts, films and want to explore the world in different ways. I am studying comparative literature in Jadavpur University. But sometimes I like to flee away from this earth to observe it from a different planet.

Read this review in English.

ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।

Related Updates

Comments

Follow Us

Show Calendar

  • 24

    May2018

    Hokas Fokas | Bengali Play... more

  • 24

    May2018

    Becharamer Biye | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Anupama Ekti Meyer Naam | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Furut | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Juganayok | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Awddyo Shesh Rajani | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Briksha | Bengali Play... more

  • 01

    Jun2018

    Rohola | 7th International Theatre Festival of Bratyajon | English Play | 2:30pm | Academy of Fine Arts | Digital Theatre, Algeria... more

  • 01

    Jun2018

    Bousadiya Sound | 7th International Theatre Festival of Bratyajon | English Play | 4:00pm | Academy of Fine Arts | Digital Theatre, Algeria... more

  • 01

    Jun2018

    Nazrul Mela 2018 | Musical Concert... more

  • 01

    Jun2018

    Kolkata Comedy Festival | Stand-Up... more

  • 01

    Jun2018

    Guns’N Roses | Bengali Play... more

  • 01

    Jun2018

    17th July | 7th International Theatre Festival of Bratyajon | Bengali Play... more

  • 01

    Jun2018

    Hulalla Bengali Play 1.6.18 7:30pm Tapan Theatre Rangan... more

Message Us