হৃদিপাশ – কিছু প্রাপ্তি, কিছু প্রশ্ন

Posted by Kaahon Desk On August 22, 2017

গত ১৩’ই আগস্ট থিয়েটার প্ল্যাটফর্ম প্রযোজিত হৃদিপাশ নাটকটি দেখা প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি মেশানো এক অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নাটকের টেক্সট, যার রচয়িতা ব্রাত্য বসু। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে সোফোক্লেসের লেখা ইডিপাস নাটকের কাছে যুগে যুগে নাট্যকাররা ফিরে গেছেন, আজও যাচ্ছেন, এবং আগামীতেও যাবেন। কিন্তু কেন? কারণ বোধহয়, খুব সংক্ষেপে বললে, এই নাটকের বিষয়গত মূলে থাকা দুটি প্রশ্ন –‘আমরা নিজেদের জীবনের নিয়ন্ত্রক কিনা’ এবং ‘আমরা যে আসলে ঠিক কে বা কি সেই সত্যানুসন্ধান করা সম্ভব বা উচিত কিনা’? এই দুটি প্রশ্ন আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক, যতটা তা ছিল সোফোক্লেসের সময়। ব্রাত্য’ও তার অভিযোজিত নাটকে এই প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এবং আশ্চর্যের বিষয়, ঘটনার স্থান, কাল, পাত্র আমূল বদলে দিয়েও এই প্রশ্নগুলোর সেই উত্তর’ই পাচ্ছেন যা সোফোক্লেস পেয়েছিলেন সহস্রাধিক বছর আগে। হৃদিপাশ নাটকের সময়কাল ১৯৪৭-এর আগে পরের কয়েক বছর এবং তার স্থানিক প্রেক্ষাপট এখনকার বাংলাদেশ, কলকাতা ও পুরুলিয়া। চরিত্ররা বেশির ভাগই বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান এবং কিছুজন উপজাতীয়। ব্রাত্য অসাধারণ দক্ষতার সাথে মূল নাটকের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্লট ডিটেইল অক্ষুণ্ণ রেখে লিখেছেন এই নতুন নাটক, যা নতুন হয়েছে পুরোনোর সাথে সর্বদা সম্পৃক্ত থেকেই। অভিযোজন তো এটাই দাবী করে – মূল টেক্সটের ভিত্তিভূমি থেকে উঠে এসে একটি নতুন টেক্সটের জন্ম হওয়া।

Previous Kaahon Theatre Review:

দ্বিতীয় বড় প্রাপ্তি নাট্যে ব্যবহৃত পর্দার, যার অনিবার্যতা তৈরি করে দেয় নাটকের টেক্সটই। অন্যভাবে বললে, নাটক রচিত হয়েছে পর্দা ভেবে নিয়েই। অনুমান করছি, ব্রাত্য বসু ও নির্দেশক তথা মঞ্চবিন্যাসকারী দেবাশিস রায় একযোগে মঞ্চে একাধিক পর্দা বারংবার নানাবিধভাবে সরানোর দৃশ্যকল্প নিজেদের মাথায় রেখেই নাটক রচনার ও পাশাপাশি নাট্যটি মঞ্চে কেমন ভাবে উঠবে সেটা কল্পনা করার কাজে এগিয়েছিলেন। কিন্তু মঞ্চজোড়া একটি বিশাল ধাতব ফ্রেমে ঝোলানো অনেকগুলি পর্দা নানাভাবে টেনে সরিয়ে চরিত্র ও ঘটনাকে কখনো পুরো, কখনো আংশিক বা কখনো সম্পূর্ণ অদৃশ্য করা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো কেন? কারণ এর মধ্যে দিয়ে পারফর্ম করা হয়েছে নাটকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থীম – দৃষ্টি ও অন্তর্দৃষ্টি। যারা সোফোক্লেস পড়েছেন তারা বিলক্ষণ জানেন সারা নাটক জুড়েই আছে সত্যকে দেখতে পাওয়া না পাওয়া, দেখার পর না দেখতে চাওয়া, দৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও না দেখতে পারা আর অন্ধ হয়েও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া নিয়ে নানান ভাবনা চিন্তা। হৃদিপাশের মূল চরিত্র হৃদয় চোখ থেকেও অন্ধ, তার আশেপাশের মানুষরাও তাদের জানা অর্ধসত্য ও মিথ্যার আলো-আঁধারিতে কিছুটা দেখে, কিছুটা দেখতে পায় না। তাই পর্দা। নাটকে নিহিত একটি বিমূর্ত, দার্শনিক ভাবনা পারফরম্যান্সের ভাষায় জীবন্ত হয়ে ওঠে মঞ্চে আন্দোলিত পর্দায় – হৃদিপাশ নাট্যে পর্দার প্রয়োগ দেখায় মঞ্চ ও প্রপ কিভাবে আখ্যানের দার্শনিক ভরকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। অনুমানে স্থির থেকে ব্রাত্য ও দেবাশিস দুজনেরই সৃজনী কল্পনাকে শ্রদ্ধা জানালাম পর্দার এই অনন্য ব্যবহারের জন্য।

আর প্রাপ্তি সব মিলিয়ে প্রায় পঁয়ত্রিশ জন কুশীলবের অভিনয়। যারা কম সংলাপের, কম মঞ্চ-সময়ের কাজ করেছেন তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চরিত্র হয়ে চলাফেরা, কথা বলার তারতম্য ঘটিয়ে নাটকের আখ্যানকে তরতর করে বয়ে নিয়ে গেছেন। তাদের কাজে সনিষ্ঠ অনুশীলনের ছাপ স্পষ্ট; স্থানাভাবে আলাদা করে তাদের নামোল্লেখ না করতে পারার জন্য মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। সুমিত কুমার রায় (হৃদয় ১) অক্লান্ত পরিশ্রম করে অভিনয় করেছেন। তার অভিনয়ে অভিনয় দেখতে পাওয়ার মাত্রাটা ক্রমাগত কমে আসছে। আমার ধারণা কিছুদিনের মধ্যেই সুমিত অভিনয়ের ব্যাকরণ এতটাই মজ্জায় মিশিয়ে ফেলবেন যে তিনি ব্যাকরণ ছাপিয়ে গিয়ে অভিনয় করতে দ্বিধা করবেন না, যে দ্বিধা তার এখনো আছে। তবে এটা বলতেই হবে প্রাণচঞ্চল, সদ্যযুবা হৃদয়ের আত্মপরিচয়ের খোঁজে যে অপাপবিদ্ধ ছটফটানির অনুষঙ্গ সুমিত তার বাচিকে ও চলাফেরায় এনেছেন তা চরিত্রটিকে বিশেষ প্রাণ দিয়েছে। প্রসেনজিত বর্ধন তার করা দুটো সম্পূর্ণ আলাদা মেরুর চরিত্রে অনবদ্য – একটিতে তাকে অভিনয় করতে হয় মূলত কন্ঠ দিয়ে (শিক্ষিত, রাজনৈতিক বিশ্লেষণে পারঙ্গম ওয়াহিদ), অন্যটিতে মূলত শরীর দিয়ে (বড়ামদেবতা, লোধাদের ক্রূর অপদেবতা)। প্রসেনজিতের মধ্যে অভিনেতা হিসেবে সেই নমনীয়তা আছে যার দ্বারা তিনি যে চরিত্রেই প্রবেশ করুন না কেন, চরিত্রটিকে টইটম্বুর ভরিয়ে দেন। প্রসঙ্গত, শুধু প্রসেনজিতের করা দুটি চরিত্র দিয়েই উল্লেখ করা যায় এই নাটকে মেক-আপের অনস্বীকার্য গুরুত্ব (মহম্মদ আলী ও সঞ্জয় পাল) – বড়ামদেবতা হতে মেক-আপ প্রভূত সাহায্য করেছে তা প্রসেনজিত নিশ্চই স্বীকার করবেন, যেমন স্বীকার করবেন অন্যরা যারা বিশেষভাবে ওই দুই মেক-আপ শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় সজ্জিত হয়েছেন। কুলসুমের খুব ছোট চরিত্রে আম্রপালী মিত্র মঞ্চে আনেন, তার গোটা শারীরিক উপস্থিতি দিয়ে, স্বাভাবিক জীবন, যৌবন ও সুখের এমন একটা মূর্ত অবয়ব যা হৃদয় পেয়েও হারাবে, এবং তার ট্র্যাজেডি হবে গভীরতর। গয়াকাকার ভূমিকায় গৌতম সরকার অত্যন্ত সাবলীল। কম বয়েসে, সকলের সাথে খাওয়ায় ও আড্ডায় মশগুল থেকেও প্রিয় নারীর সাথে চকিত দৃষ্টি বিনিময়েই হোক, বা পরের দিকে শরীরের গাঁটে গাঁটে বয়েসের ভার বয়ে নেওয়াতেই হোক, গৌতম তার চরিত্রটিকে মস্তিষ্ক দিয়ে নির্মাণ করেছেন ও গোটা দেহ, চাহনি, কন্ঠ ব্যবহার করে মঞ্চায়িত করেছেন। ইন্দুদীপা সিনহা, সৌমক ভট্টাচার্য, অপূর্ব ঘোষ এবং অন্যান্যরা সকলেই তাদের চরিত্র সযত্ন সক্ষমতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।

শেষ করব অপ্রাপ্তি দিয়ে। হৃদয় চরিত্রটি দুজন অভিনেতাকে দিয়ে করানোর কোন টেক্সটগত বা নাট্যগত যুক্তি বোধগম্য হল না। সেদিন অভিনেতা হিসেবে দেবাশিস (হৃদয় ২) বলা যায় ‘আউট অফ ফর্ম’ ছিলেন। তার বেশ কিছু সংলাপ শোনা যায় নি, তার হাঁটাচলার মধ্যে একটা ক্লান্তির ছাপ ছিল যা চরিত্রের ক্লান্তির থেকে পৃথক। তবে সেটাই সমস্যার একমাত্র কারণ নয়। দুজন হৃদয় নাট্যে কোন অর্থবহ তাৎপর্য আনে বলে মনে হয় না, বরং তাতে একধরণের বিদারণ ঘটে চরিত্রটিকে দর্শক হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে। এই বিদারণের অভিঘাত কিছুটা কমতে পারত যদি দেখতাম বয়স্ক হৃদয়ের মধ্যে কম বয়েসী হৃদয় আছে– চেহারায় নয় (কারণ বয়েসে চেহারা অনেকটাই পাল্টে যায়)কিন্তু কিছু ছোট অথচ খুব স্বাতন্ত্র্যসূচকআচারে, মুদ্রায়, হাবেভাবে। সেরকম কিছুই সেদিন পাওয়া গেল না। আর হৃদয়ের বয়েস বাড়লেও তার রানীর ও তার ভাইয়ের বয়েস কেন বাড়বে না সেটাও বোঝা দুষ্কর। অনেক ভেবে একটাই কারণ পেলাম-“এক জোড়া হৃদয়”।

নাট্যের একদম শেষে একটা অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা হয় – সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মত একটা দৃশ্য (যা দেখলে সোফোক্লেস শিউরে উঠতেন) যেখানে বড় হৃদয় দেখে ছোট হৃদয় তার বাবার হাতে খুন হচ্ছে। অর্থাৎ, সামনে আনা হল একধরণের মৃত্যুকামনা, যা হৃদয়কে মেরে তাকে তার নিয়তির গ্রাস থেকে মুক্ত করবে। এই দৃশ্য শুধু যে সম্পূর্ণ অনাবশ্যক তা নয়। নাটকের মূল বক্তব্য হচ্ছে নিয়তির দ্বারা বা ইতিহাসের রথের চাকায় তলায় পিষে মরাই মানুষের ভবিতব্য, আর এই দৃশ্য সেই বক্তব্যেকেই খণ্ডন করে। হ্যাঁ, এই দৃশ্যায়নে দুজন হৃদয়কে একই মুহূর্তে মঞ্চে লাগে বটে, কিন্তু সাথে সাথে কিছু প্রশ্নও উঠে যায়।

প্রশ্ন ১। এটা মানতে অসুবিধে হয় না যে জায়গায় জায়গায় অভিযোজিত নাটক আকর নাটকের থেকে আলাদা – এখানে খুন হয় সর্বসমক্ষে, এখানে হৃদয় নিজেকে শেষে অন্ধ করে না। কিন্তু বাবার হাতে হৃদয় মারা যাচ্ছে এই দৃশ্য (যদিও কল্পনায়) মঞ্চে আনলে সোফোক্লেসের হাত শুধু ছাড়া হয় না, তার বিপরীতে যাওয়া হয়। খুব বেশি মাত্রায় সোফোক্লেস ত্যাগের ফল নিয়ে নির্মাতারা সচেতন তো? হৃদিপাশকে যদি তার গ্রীক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তাহলে ১৯৪৭-এর একটি শিক্ষিত, দেশকালের খবর রাখা পরিবারের একজনের পীরের ভবিষ্যদ্বাণী প্রশ্নহীন বিশ্বাসে মেনে নেওয়াটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। প্রশ্নের মুখে পড়ে যায় তার কয়েক বছর আগে দেবীর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে এক শিক্ষিত দম্পতির (স্ত্রী খ্রিস্টান মিশনারীদের দ্বারা পালিত এবং দুমকা কলেজের ছাত্রী) তাদের নবজাত শিশুকে মেরে ফেলার উদ্যোগে। যারা বলবেন মন্ত্রে তন্ত্রে ডাইনীতে বিশ্বাস এখনো তো বর্তমান, তাদের মনে করিয়ে দেব যে সাধারণভাবে আজকের বৃহত্তর সমাজ এই বিশ্বাসকে নাকচ করেছে। কিন্তু প্রাচীন গ্রীক দেশে জীবনের ওপর বিবিধ দেবদেবীর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করতেন না এমন মানুষ কমই ছিলেন (দ্রষ্টব্য – The Seer in Ancient Greece by M. Flower এবং Delphi: A History of the Centre of the Ancient World; Chapter 1, Oracle by M. Scott), যে কারণে সোফোক্লেসকে দৈববাণীতে বিশ্বাস রাখার কোন আলাদা জমি প্রস্তুত করতে হয়নি তার নাটকে। সেই জমি হৃদিপাশ নাটক’ও তৈরী করেনি কারণ সে সেখানে জড়িয়ে থেকেছে প্রাচীন নাটকটির সাথে। প্রয়োজনে জড়াব আর ইচ্ছে হলে ছেড়ে দেব, এ ধরণের ভাবনা অভিযোজনের মন্ত্র হতে পারে না।

প্রশ্ন ২। থিয়েটারের নিজস্ব ভাষা কি এত দরিদ্র হয়ে গেছে যে নাট্যে ফ্ল্যাশব্যাক করতে সিনেমার অভিধানে হাত দিতে হবে? আসলে একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যায় যে গোটা প্রযোজনাটির বিন্যাসেই আছে প্রায় সিনেমার আদলে একটি অডিও-ভিস্যুয়াল স্পেক্ট্যাকেল তৈরী করার প্রচেষ্টা। গান বাজনা শব্দ আলো রঙের অফুরন্ত ব্যবহারে শ্রবণ-দর্শন বিনোদনের যে আয়োজন গোটা হৃদিপাশ জুড়ে, তা আসলে নাট্যের অভিঘাতকে লঘু করে দেয়, যে নাট্যের ভিত্তি আবার এমন একটি সুপ্রাচীন ট্র্যাজেডি, এরিস্টোটলের মতে যা নিখুঁত ট্র্যাজেডির আদিরূপ। বেশির ভাগ দর্শকের প্রতিক্রিয়া নাটক “দারুণ ভালো লেগেছে” না হয়ে যদি “আসলে আমরা নিছকই পোকা মাকড় বুঝতে পেরে ভয় করছে, অবসন্ন লাগছে”- এরকমটা হত, তাহলে হৃদিপাশ জিতে যেত। তা হয়েছে কি?

দীপঙ্কর সেন

Read this review in English.

ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।

Related Updates

Comments

Follow Us

Show Calendar

  • 24

    May2018

    Hokas Fokas | Bengali Play... more

  • 24

    May2018

    Becharamer Biye | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Anupama Ekti Meyer Naam | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Furut | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Juganayok | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Awddyo Shesh Rajani | Bengali Play... more

  • 25

    May2018

    Briksha | Bengali Play... more

  • 01

    Jun2018

    Rohola | 7th International Theatre Festival of Bratyajon | English Play | 2:30pm | Academy of Fine Arts | Digital Theatre, Algeria... more

  • 01

    Jun2018

    Bousadiya Sound | 7th International Theatre Festival of Bratyajon | English Play | 4:00pm | Academy of Fine Arts | Digital Theatre, Algeria... more

  • 01

    Jun2018

    Nazrul Mela 2018 | Musical Concert... more

  • 01

    Jun2018

    Kolkata Comedy Festival | Stand-Up... more

  • 01

    Jun2018

    Guns’N Roses | Bengali Play... more

  • 01

    Jun2018

    17th July | 7th International Theatre Festival of Bratyajon | Bengali Play... more

  • 01

    Jun2018

    Hulalla Bengali Play 1.6.18 7:30pm Tapan Theatre Rangan... more

Message Us