সহজ পাঠের গপ্পো: একটি সার্থক বাংলা ছবি এবং তাই আন্তর্জাতিক

Posted by Kaahon Desk On September 14, 2017

সহজ পাঠের গপ্পো । এমনিতে ট্রেলার দেখে ভালোলেগে ছিল। গ্রাম বাংলার সাধারণ ছবি বাংলা ছবির ট্রেলারে সাধারণত দেখা যায়না। খুবই হুরুমধুরুম করে আওয়াজ হয় আর ভিস্যুয়াল চচ্চড়ি তৈরি করার প্রচেষ্টা দেখা যায়।যাক গে…বিভূতিভূষণের তালনবমী গল্পটি নিয়ে ছবি আগেও হয়েছে। শ্রী ধনঞ্জয় মণ্ডলের তৈরি করা। সেই ছবিটির নামও তালনবমী। আমার দেখা হয়নি। আমি ওঁর পদ্ম পাতার জল এবং আর দুএকটি তথ্যচিত্র দেখেছি। আজকাল একটা কথা খুব চলে ‘অরগ্যানিক’। ধনঞ্জয় মণ্ডলকে আমার অরগ্যানিক পরিচালক মনে হত। উনি যেভাবে নিজের টাকায় ছবি বানিয়েছেন, ননঅ্যাক্টরদের নিয়ে ছবি করেছেন বা গ্রামে যেভাবে শ্যুট করার গল্প শুনেছি বা গঙ্গাসাগর মেলাতে গিয়ে নিজের হাতে ছবির ডিভিডি বিক্রি করার গল্প শুনেছি (সমস্তটাই শব্দ শিল্পী পার্থ বর্মণের কাছে শোনা), তাতে ওঁকে সঠিক অর্থেই স্বাধীন এবং অল্টারনেটিভ পরিচালক বলা চলে। এতকথা বলছি কারণ শ্রী মানস মুকুল পাল পরিচালিত সহজ পাঠের গপ্পো-ও বিভূতিভূষণেরতালনবমী গল্প অবলম্বনে তৈরি এবং ধনঞ্জয় মণ্ডলকে মনেহয় না বেশি লোক চেনেন। তাই এই প্রসঙ্গে ওঁর কথাও বলে রাখলাম। এবারে সহজ পাঠের গপ্পো প্রসঙ্গে আলাপ করা যাক।

ছবির গল্প নিয়ে বেশি কথা বলতে চাইনা। যারা মূল গল্পটি পড়েননি বা ভুলেগিয়েছেন বা একটু একটু মনে আছে তাঁদের অনুরোধ করবো ছবিটি আগে দেখে আসুন, পরে মূলগল্পটি পড়ে নেবেন।

Previous Kaahon Review:

ছবির গল্পটি মূলত দুই ভাই ছোটু ও গোপালকে কেন্দ্র করে যাদের বয়স যথাক্রমে আনুমানিক ৬ এবং ১০। ওদের বাবা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন কিন্তু বর্তমানে একটি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে শয্যাশায়ী। ফলত সংসারে রোজগার বন্ধ। মা খুব কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন। বড় ভাই গোপাল বুঝতে পারে ওকে কাজ করে রোজগার করতে হবে। তাই ও ভাই ছোটুকে সঙ্গে করে বিভিন্ন কাজকম্ম শুরু করে। লোকের বাড়ির কুয়ো পরিষ্কার থেকে শুরু করে হাটে গিয়ে তাল বিক্রি করা অবধি। এই সময় জন্মাষ্টমী উপলক্ষে গ্রামের একটি ধনী প্রভাবশালী ব্রাহ্মণ পরিবার বিরাট পুজোর অনুষ্ঠান আয়োজন করে।যার মূল আকর্ষণ গ্রামের সবাইকে নেমন্তন্ন করে পোলাও খাওয়ানো হবে। সেইমত দুই ভাই তাদের নিজেদের মত করে পরিকল্পনা করতে থাকে। গোপাল ভাবে পুজো উপলক্ষে যদি দুটো তাল বিক্রি করে কিছু টাকা উপার্জন করা যায় আর ছোটু পোলাও এর স্বপ্ন দেখতে থাকে। এর আগে সে কোনদিন পোলাও খায়নি। বাকিটা ছবিতে দেখে নেবেন।

এবারে বলি ছবিটি বেশ ভালো লেগেছে। তার কারণ গল্প বলার ভঙ্গীটি অত্যন্ত সরল এবং সাদামাটা যা আয়ত্বে আনা যেকোনো চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালকের পক্ষেই খুব কঠিন কাজ। সাধারণতঃ লেখার সময় বা পরিচালনা করার সময় (শট নেওয়া, ফ্রেম নির্বাচন, ডায়ালগ এবং তার ডেলিভারি, সম্পাদনা, স্থাননির্বাচন, পোশাক নির্বাচন) ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা জীবনদর্শন ছবিতে ফুটে ওঠে এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যার ব্যাপার হল সেগুলো সাধারণত চেষ্টাকৃত সংলাপ (যে গুলোকে বুকিশ বলা চলে), বা চড়া আবহসঙ্গীত বা অবাস্তব ভিস্যুয়াল তৈরি করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে একটু শিল্প শিল্প ব্যাপার মনে হলেও কিছুদিন পরেই হাস্যকর মনে হতে থাকে। এই ছবিতে সেসব অনুপস্থিত। বেশিরভাগ জায়গায় জোর করে কিছু বলার চেষ্টা হয়নি। ইমেজের জাগলারি নেই বা অর্থহীন মন্তাজ তৈরি করা হয়নি। শট নেওয়া হয়েছে এমন ভাবে এবং তাকে এমন ভাবে ধৈর্য সহকারে সম্পাদনা করা হয়েছে যে সেখানে কোন অস্থিরতা প্রকাশ পায়নি। অথচ ছবিটি আমাকে এক অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দেয়। সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে এসে নিশ্চিন্তমনে রেস্তরাঁতে ডিনার করতে করতে আগামীকালের প্ল্যান ভাবতে দেয়না। কারণ বহুদিন বাদে বাংলা কাহিনিচিত্রে এমন কিছু চরিত্র এমন কিছু ঘটনা এমন কিছু দৃশ্য এমন কিছু মুহূর্ত দেখলাম যেগুলো ইদানিং বাংলা ছবিতে বিরল। একটি ভ্যান চালকের পরিবার ও তাদের দুঃখ কষ্ট নিয়ে ছবি তৈরি করার কথা ভাবলে আমরা বাঙালি পরিচালকেরা প্রথমেই ভাবি কেউ দেখবে না। সুতরাং লেখার সময় ভ্যান চালককে মার্সিডিজ চালকে রূপান্তরিত করি যাতে অ্যাটলিস্ট একটু ঝকঝকে আলো, জামাকাপড়, চেনা পরিচিত সুন্দর মুখ ইত্যাদি দেখানো যায়। এসব ভাবনা এইছবিতে একেবারেই অমিল। সম্পূর্ণ অচেনা কিছু লোকজন কাজ করেছেন এই ছবিতে। পরিচালক এবং তাঁর দলের এই জন্য বেশ খানিকক্ষণ ধরে ধন্যবাদ প্রাপ্য।

মনে থেকে যাচ্ছে ট্রেনের দৃশ্যটির কথা। এই দৃশ্যের কথা ডিটেইলে লিখছিনা। দর্শক দেখুন। এই দৃশ্যটি এবং আরও কিছু দৃশ্য অবধারিত ভাবে পথের পাঁচালি-র কথা মনে করিয়ে দেবে। এসব দৃশ্যে প্রত্যেকটা বিভাগের কাজ অসাধারণ। সে শব্দ বলুন, অভিনয় বলুন, চিত্রনাট্য বলুন, সম্পাদনা বলুন বা শট টেকিং বলুন। সবমিলে এই দৃশ্যটি সাঙ্ঘাতিক একটা অভিঘাত সৃষ্টি করে দর্শকের মনে। যদিও একটি দৃশ্যে হঠাৎ করে ডিজল্ভের ব্যবহার ভালো লাগলো না।

খুব গুরুত্বপূর্ণ ছবির বাচিকভাষা। এখানে উত্তর চব্বিশ পরগণার গ্রামাঞ্চলের একটি স্থানীয় ডায়ালেক্ট ব্যবহার করা হয়েছে। মূল চরিত্ররা সেই ভাষাতেই কথা বলে। ছবি দেখলে বোঝা যায় অভিনেতারা এই ডায়ালেক্ট দীর্ঘদিন অভ্যাস করেছেন। তাই বাচিক কথোপকথন প্রায় স্বাভাবিক লাগে। যদিও দু-এক জায়গায় একটু আড়ষ্ট ঠেকে। তাতে কি? বাংলার স্থান কালপাত্র এখানে সপাটে উপস্থিত। কলকাতা ছাড়াও যে এ বঙ্গে অন্যান্য জায়গা আছে, ভাষা আছে, গরীব মানুষের জীবন, গরীব বড়লোকের একটা হায়ারারকিক্যাল সম্পর্ক আছে, সেসব আবার নতুন করে টের পাওয়া যায় এছবি দেখলে। নইলে স্কচ হুইস্কি আর রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বঙ্গজীবনের অঙ্গ বানানোর সচেতন প্রয়াস বহুদিন ধরে চলছে বাংলা সিনেমায়। এখানে দেখি ব্রাহ্মণ মালকিন তাঁর স্নেহচ্ছায়া দিয়ে সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করছেন আড়ালে থাকা এক বৃদ্ধ (যিনি ব্রাহ্মণীকে হুকুম করছেন এক কাপ চা পাঠিয়ে দিতে বলে)। এই অদৃশ্য বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকেই সেই বিরাট বাড়ি বলে মনে হয় যে বাড়িটি গরীব বাচ্চা ছেলের কাছ থেকে তাল নিয়ে তার প্রাপ্য পয়সা মেরে দেওয়ার টাকায় তৈরি হয়েছে।

সংসার চলছে না। এই সময়ে আমরা দেখতে পাই বড়ভাই গোপাল তার ছোটবেলার ইনোসেন্স, পড়াশুনো বিসর্জন দিয়ে রোজগার করার চেষ্টা করতে শুরু করে। ছোটু কিন্তু তা পারে না। সেই কারণেই সহজপাঠেরগপ্পো  তৈরি হয়। গোপাল তাল বিক্রি করে ১০ টাকায়। ঠিক সেই সময় তার পাশেই ১৫ টাকার কমে তাল বিক্রি হচ্ছিল না। এবং একটি লোক জিজ্ঞেস  করে গোপাল কেন স্কুলে যাচ্ছেনা টাচ্ছেনা এবং গোপালের কাছে দর করে সেই তাল ৮ টাকায় কিনে নিয়ে যায়। এইখানে সমাজের হায়ারারকিটা ফুটে ওঠে। যদিও আর একটি কথাও মনে হয়, এক্ষেত্রে গোপাল যে পড়ে থাকা তাল তুলে নিয়ে বিক্রি করতে যাচ্ছে, তাকে কেউ বাধা দিচ্ছেনা, কেন?  সাধারণভাবে গোপালকে মালিক পক্ষের বাধার সম্মুখীন হতে হওয়ার কথা। বিভূতিভূষণের সময় যা ফ্রিতে পাওয়া যেত এখন তা ফ্রি পাওয়া সম্ভব নয়। যদিও পরিচালক এই বিষয়টা ধোঁয়াশা রেখেছেন। বাগানের মালিককে, কেউ কিছু বললো না কেন ইত্যাদি এত সব দেখানো হয়নি।

অভিনয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। বিশেষ করে ছোটুর ভূমিকায় নূর আলম, গোপালের ভূমিকায় সামিউল ইসলাম এবং মায়ের ভূমিকায় স্নেহা চৌধুরীর অভিনয় এবং তাঁদেরকে সেই চরিত্রগুলিতে নির্বাচন খুবই চমৎকার।

এই ছবিটি আমার মতে পলিটিক্যাল। ছবিটি এইভাবে বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তার ভাষা নির্বাচন, চরিত্র নির্বাচন, অভিনেতা নির্বাচন, পোশাক নির্বাচন, শট টেকিং, ছবি করবার পদ্ধতি প্রকরণ, এবং সর্বোপরি শাক ভাত এবং পোলাও-এর দ্বন্দ্ব এইছবিকে বহুদূরে টেনে নিয়ে যায়।

স্বপ্নদৃশ্য এই ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও গোপালের স্বপ্নদৃশ্যটি যে অভিঘাত তৈরি করে, ছোটুর স্বপ্নদৃশ্যটির ক্ষেত্রে সেটি তৈরি হয় না  কারণ এক্ষেত্রে আগেই বুঝে যাওয়া যায় যে পরে কি হতে চলেছে। ছবির কিছু জায়গায় কন্টিনিউটির সমস্যা চোখে পড়ে। দু-একবার ছবি দেখতে দেখতে তার ক্যামেরা, সাউন্ড ইত্যাদির দিকে মন চলে যাচ্ছিল…ভালো  লাগার ছবি প্রথমবার দেখার সময় সাধারণত এগুলি চোখে পড়েনা।

আবহসঙ্গীত এই ছবিতে এসেছে। হয়তো না আসলেও পারতো তার জায়গায় সাউন্ডডিজাইন আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারত।

বৃষ্টি এই ছবিতে এসেছে। তাকে আসতেই হত।

বাংলার হাট, ছাতা, কলমি শাক, কুয়ো, কীর্তন, আজান সবাইকেই আসতে হত। এসেছে। তা ছবিটিকে আমরা সার্থক বাংলা ছবি বলতে পারি এবং তাই আন্তর্জাতিক।

সবশেষে, সহজ পাঠের গপ্পো  বাংলা ছবির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

বিভূতিভূষণ দশকের পর দশক বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন, সেই অর্থে ওঁকে বাংলা সিনেমার সেভিয়ার-ও বলা যায়।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য

Read this review in English.

ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।

Kaahon Cinema Reviews:

Related Updates

Comments

Follow Us

Show Calendar

  • 19

    Mar2019

    Re-Fulshajya | Bengali Play... more

  • 19

    Mar2019

    Supta Basana | 17th Theatre Festival of Shohan | Bengali Play | 6:30pm | Minerva Theatre | Eshan Chunchura... more

  • 19

    Mar2019

    Doodh Kheyeche Meow | Bengali Play... more

  • 19

    Mar2019

    Dolachal | Bengali Play... more

  • 19

    Mar2019

    Tyag | 17th Theatre Festival of Shohan | Bengali Play | 7:30pm | Minerva Theatre | Mahishadal Shilpakriti... more

  • 21

    Mar2019

    Kenaram Becharam | Bengali Play... more

  • 22

    Mar2019

    Shadow | Bengali Play... more

  • 05

    Apr2019

    Charjapader Kobi | Bengali Play... more

  • 19

    Apr2019

    Pratibimba | Bengali Play... more

Message Us